* সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ হলেও জবি শিক্ষার্থীরা দাবি আদায়ে সচিবালয় ঘেরাও করেছে
* গত ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে বাড়ছে অপরাধ
* আগামী ৭ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশের ডাক তাবলীগ জামায়াতের
* দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতি ও খাদ্য অস্বস্তি
* সরকারের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধীদের দূরত্বের কথা স্বীকার সমন্বয়কের
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমানে এই সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সংখ্যা ২৪ জন। তবে ৩ মাস ৬ দিন পেরোতে না পেরোতেই অসন্তোষ-নানা সমালোচনায় বহুমুখী চাপে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই চাপগুলোর মধ্যে রয়েছে-বিশ্ব ইজতেমা ও কাকরাইল মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাবলীগ জামায়াতের মুখোমুখি অবস্থান, অতিদ্রুত রাজনৈতিক দলগুলোর চাওয়া ত্রয়োদ্বশ নির্বাচন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, উপদেষ্টা পরিষদে ও বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন নতুন নিয়োগ নিয়ে সমমনাদের তীব্র সমালোচনা, বিভিন্ন মহল থেকে নতুন উপদেষ্টা হওয়ার আগ্রহ, দাবি-দাওয়া নিয়ে অসন্তোষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানান সমালোচনায় ক্রমেই চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর। তবে আপাতত এসব ক্ষোভ-অসন্তোষ সামাল দিতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তার উপর নানান দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সামাল দিতে মাঝেমধ্যেই হিমশিম খেতে হচ্ছে এই সরকার।
সরকারের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধীদের দূরত্ব বাড়ছে: বেশ কিছুদিন ধরেই গুঞ্জন উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি এই কথা স্বীকার কররো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন ইস্যুতে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে জানিয়ে মাহিন সরকার বলেন এ দূরত্ব ঘোচাতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই অবস্থায় বিশ্লেষকদের কেউ কেউ উপদেষ্টা পরিষদে আরও ছাত্র প্রতিনিধি নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা বলেন, ছাত্রদের মতামতকে প্রাধান্য না দিলে অস্থিরতায় পড়বে সরকার। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরামর্শ অনুযায়ী গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। শুরু থেকেই চাপ প্রয়োগকারী গোষ্ঠী হিসেবে নানা ইস্যুতে ইউনূস সরকারকে পরামর্শ দিয়ে আসার কথা বলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের তিন মাস না পেরুতেই রাষ্ট্রপতির অপসারণ, নতুন করে আরও তিনজনকে উপদেষ্টা পরিষদে নিয়োগ ও আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসহ কয়েকটি ইস্যুতে অসন্তোষ জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। মাহিন সরকার বলেন, কিছু কিছু জায়গা আছে যেখানে বিরোধিতা করা যায় এবং আমরা সেটা করছি। তবে সর্বশেষ ঘটনাগুলো অবশ্যই ভাবার মতো। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ হতে দেবেন না তারা। তিনি বলেন, এই সরকারকে ব্যর্থ করে দেয়ার মতো অবস্থানে আমরা যাবো না। সেটা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়। কারণ, এটি জাতীয় ঐক্যমতের সরকার। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাব্বির আহমেদ বলছেন, ছাত্রদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়লে অস্থিরতায় পড়বে অন্তর্বর্তী সরকার, এজন্য উপদেষ্টা পরিষদে আরও ছাত্র প্রতিনিধি নেয়ার পরামর্শ তার। তিনি বলেন, যারা জীবন দিলো বা যারা সেক্রিফাইস করলো ওই অংশের মধ্যে কিন্তু কোনো প্রতিনিধি নাই। ওখান থেকে একটু বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া প্রথম সারির যেকজন আছে এখান থেকে একটু বাড়ানো যেতে পারে।
ইসির তালিকায় জেসমিন টুলীর নাম, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ: নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নতুন কমিশনে সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী এবং বিতর্কিত নির্বাচন কর্মকর্তা জেসমিন টুলীর নাম দেখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ছাত্র-জনতা, সুশীল সমাজ এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মীরা। তারা ইসির এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জানা গেছে, জেসমিন টুলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী। ২০০১ সালের নির্বাচনে নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি ও ভোট তালিকা গায়েব করার অভিযোগে আলোচিত ছিলেন। এছাড়া, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। এর পাশাপাশি, ২০০৮ সালে বিএনপির নির্বাচনী পরাজয়ের পেছনে জেসমিন টুলীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন, অবসর নেয়ার পর তিনি নির্বাচন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন এবং নির্বাচন কমিশনের সংস্কারের জন্য কাজ করছেন। তবে, তার নাম ইসির নতুন তালিকায় থাকা নিয়ে ছাত্র-জনতার মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন এই সিদ্ধান্ত সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রকে আরও শক্তিশালী করবে।
সভাসমাবেশ নিষিদ্ধের পরও জবি শিক্ষার্থীদের সচিবালয় ঘেরাও: পরীক্ষা না দিয়ে এইচএসসিতে কয়েক বিষয়ে ছাত্রদের অটোপাসের আন্দোলন সফল হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা যেন হালে পানি পেয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সচিবালয় এলাকায় কোনো সভাসমাবেশ নিষিদ্ধের ঘোষণা দিলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঘেরাও করেছিলেন সচিবালয়। নতুন ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীকে হস্তান্তর, ইউজিসি প্রস্তাবিত পাইলট প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তিসহ পাঁচ দাবি নিয়ে গত সোমবার এ কর্মসূচি পালন করেন তারা। এ সময় তরুণ এক উপদেষ্টার উপস্থিতিতে দেয়া স্লোগান ঘিরে তৈরি হয় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি। যদিও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা উপদেষ্টাকে উপলক্ষ করে স্লোগান দেননি। তবে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল সরব। শুধু এ ঘটনাই নয়, নতুন নিযুক্ত দুই উপদেষ্টাকে নিয়েও সমালোচনার ঝড় উঠেছে বিভিন্ন দিক থেকে। তাদের সরিয়ে দেয়ার দাবিতে হয়েছে বিক্ষোভ সমাবেশও। দেশে ও বিদেশে বসে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নানা কর্মকর্তাদের সমালোচনায় সরব রয়েছেন। নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গত সোমবার বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, মশকরা হচ্ছে ছাত্রদের সঙ্গে। ছাত্রদের রক্তের ওপর আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ থেকে কমপক্ষে পাঁচজনকে নিয়োগ দিতে বৃহস্পতিবার রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। সড়ক অবরোধের কারণে রংপুরসহ বিভাগের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। এছাড়াও ক্ষোভ আছে পুরনো উপদেষ্টাদের নিয়েও। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আহতরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের ওপর। চিকিৎসা নিয়ে ক্রমাগত অভিযোগ করে আসা আহতরা মঙ্গলবার মধ্যরাতে সামনে পান উপদেষ্টাকে। এ সময় তিনি তোপের মুখে পড়েন। আন্দোলনে আহতদের দেখতে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) গিয়ে সবার সঙ্গে দেখা করেননি উপদেষ্টা। এ অভিযোগ তুলে হাসপাতাল থেকে বেরোনোর পথে তার পথ আটকে বিক্ষোভ করেন আহতরা। এখনো আহতরা সবাই ১ লাখ টাকা করে পাননি অভিযোগ করেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে আইন উপদেষ্টাসহ চার উপদেষ্টার আশ্বাসে তারা হাসপাতালে চলেন যান।
তাবলীগ জামায়াতের দ্বন্দ্বে সংঘাতের আশঙ্কা: তাবলীগ জামায়াতের একাংশ দিল্লির মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীরা এবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছেন। আগামী ৭ ডিসেম্বর তারা সমাবেশ করবেন। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের আগে তারা এ ঘোষণা দেন। এর আগে, পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই কাকরাইলের মারকাজ মসজিদে প্রবেশ করে সেখানে অবস্থান নেয় সাদপন্থিরা। এ কারণে ভোর থেকে ওই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এদিন সাদপন্থিদের ব্যাপক সমাগমে কাকরাইল মসজিদের আশপাশের রাস্তায় যানচলাচল সকাল থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া নিরাপত্তার স্বার্থে রমনা ও প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনে যাওয়ার পথটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে কাকরাইল মসজিদে নির্ধারিত অবস্থানের সময় শেষ হওয়ায় সুরাপন্থিরা সকালে মসজিদ থেকে সরে যান। এ বিষয়ে রমনা জোনের ডিসি গণমাধ্যমে জানান, জুবায়েরপন্থিরা চার সপ্তাহ অবস্থান করেছিলেন। আজ তারা অবস্থান ছেড়ে দিয়েছেন। এখন দুই সপ্তাহ অবস্থান করবেন সাদপন্থিরা। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যেন কোনো অবনতি না ঘটে, সেজন্য অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আজ শান্তিপূর্ণভাবে বের হয়ে যান জুবায়েরপন্থিরা, তারপর সুশৃঙ্খলভাবে প্রবেশ করেন সাদপন্থিরা। জুমার নামাজের আগ মাহূর্তে রাস্তা থেকে সারে যান অবস্থানকারীরা। এর আগে তারা আগামী ৭ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেন। এরআগে রাজধানীর নিকটত টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা ও কাকরাইল মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে থাকা তাবীলগ জামায়াতের দুই অংশ সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়াতে ‘আপাতত সংযত’ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত কিছুদিন ধরে তাদের অনড় অবস্থান ও পাল্টাপাল্টি ঘোষণায় সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা করছিলেন অনেকে। কাকরাইল মসজিদ থেকে ‘সাদপন্থিদের সরিয়ে দেয়া’ এবং ‘তাদের ইজতেমা করতে দেয়া হবে না’ বলে যারা ঘোষণা দিয়েছিলো তারা এখন বলছেন আগের সমঝোতা মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। এর ফলে কাকরাইল মসজিদ ভাগাভাগি করে ব্যবহার ও দুই পর্বের ইজতেমা আয়োজনে আগের সমঝোতা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন তারা।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বাড়ছে অপরাধ: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে হঠাৎ করে অপরাধ বেড়েছে। পুলিশের মূল্যায়ন হচ্ছে -এর মূলে রয়েছে কিশোর-তরুণ গ্যাং। হত্যা, মাদক ব্যবসা, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি দখল থেকে শুরু করে এসব অপরাধী সুযোগ পেলেই নারীদেরও উত্ত্যক্ত করছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের যেকোনো স্পটে এ ধরনের সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটলেই তাদের নামটা শুরুতেই উচ্চারিত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন করে কয়েক হাজার কিশোর-তরুণ অপরাধীর তালিকা বানিয়ে পুলিশ এরই মধ্যে তাদের গ্রেফতারে অভিযানেও নেমেছে। পুলিশের একাধিক প্রতিবেদনে কিশোর-তরুণ অপরাধীদের ব্যাপারে এ ধরনের নেতিবাচক তথ্য উঠে এসেছে। বিগত সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলের আগে রাজধানীতে অন্তত ১২৭টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় ছিল। সারা দেশে ছিল ২৩৭টি। এসব গ্যাংয়ের সদস্য ছিল দুই হাজারের বেশি। প্রতিটি থানায় তাদের তালিকা ছিল। পুলিশের দাবি মতে, গত ৫ আগস্টের আগে ও পরে দেশের বেশির ভাগ থানা নাশকতায় ধ্বংস হওয়ায় সেই তালিকাও ধ্বংস হয়ে গেছে। সংগত কারণে এখন নতুন করে কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা তৈরি করা লাগছে। তবে অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি কিশোর অপরাধের মাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তা নিয়ন্ত্রণে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। প্রয়োজনে কিশোর কারাগার ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কিশোর সংশোধন কেন্দ্রগুলোকে আরো সময়োপযোগী করে সংশোধন কার্যক্রম পরিচালনায় সক্ষম করে গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে এই কিশোর গ্যাং নির্মূলে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। কিশোর-তরুণ গ্যাং ফের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে ওঠায় নতুন তালিকা ধরে পুলিশের সব ইউনিটপ্রধানকে এরই মধ্যে নির্দেশ দিয়েছেন মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তিন মাসে ১০ জন খুন হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগ ঘটনায় কিশোর-তরুণ অপরাধীদের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাফিজুর রহমান বলেন, কয়েক দিনেই যৌথ বাহিনীর অভিযানে দেড় শতাধিক অপরাধী ধরা পড়েছে, যাদের বেশির ভাগের বয়স ১৫ থেকে ২১ বছরের মধ্যে। গত ২৮ অক্টোবর চাঁদপুর শহরে অস্ত্র নিয়ে কিশোর গ্যাং মহড়া দেয় এবং তারা দুজনকে কুপিয়ে জখম করে। পরে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আট কিশোরকে আটক করে। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় চাঁদপুরের ছায়াবাণী এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হয় ঢালীরঘাট এলাকার স্কুলছাত্র রাশেদ (১৫)। তার আগে ২৬ অক্টোবর রাতে শহরের পুরানবাজার জাফরাবাদে ওয়াজ শুনতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় গুরুতর আহত হয় আল-আমিন একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সিফাত পাটোয়ারী। চট্টগ্রামেও কিশোর-তরুণ গ্যাং সদস্যদের বাড়াবাড়িও আলোচনায় এসেছে। পুলিশ বলছে, চট্টগ্রামে আগের সরকারের আমলে ৫৭টি কিশোর-তরুণ গ্যাং ছিল। রাজশাহী, যশোর, বরিশালসহ আরো কয়েকটি জেলা ও থানা শহরে এই গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর দেশজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় পুলিশ, র্যাবসহ জেলা প্রশাসনও একাধিক বৈঠক করেছে। তবে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, সরকার পরিবর্তনের পর আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার অবনতি ঘটে। বিশেষত রাজধানীর মোহাম্মদপুরে প্রতিনিয়ত ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি ও হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। বিহারি ক্যাম্প ঘিরে মাদক কারবারিরা আধিপত্য বিস্তারে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটিয়েছে। একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেছেন, মোহাম্মদপুরে ২০টি গ্রুপে এক হাজারের বেশি কিশোর-তরুণ সদস্য রয়েছে। সূত্র মতে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এলাকায় ১৫০টি স্থায়ী ও মোবাইল চেকপোস্টের পাশাপাশি ৩০০টি মোটরসাইকেল টিম এবং ২৫০টি টহল টিম সক্রিয় রয়েছে। তবে অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী নুর খান বলেন, কিশোর-তরুণ অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সমাজে অপরাধ বাড়বে। আগেও কিশোর অপরাধীরা বেপরোয়া ছিল, সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ছিল। এখন আবার তাদের তৎপরতা চোখে লাগছে। বাড়াচ্ছে উদ্বেগও।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি-অস্বস্তি: দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতি নিয়ে মানুষের দুর্ভোগ কমছেই না। বিশেষত, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামে লাগাম টানতে পারছে না সরকার। আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও অক্টোবরে তা আবার বেড়েছে। অক্টোবর মাসে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। যা সেপ্টেম্বরে ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ আর গত আগস্টে মাসে ছিল ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অক্টোবরের তথ্যানুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে ১০০ টাকার খাদ্যপণ্যে ১২ টাকা ৬৬ পয়সা বাড়তি খরচ করতে হয়েছে ভোক্তাদের। অক্টোবরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ হয়েছে। যা সেপ্টেম্বরে এক অঙ্কে নেমে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ আর তার আগের মাস আগস্টে ছিল ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। গত ৭ নভেম্বর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতি নিয়ে চলতি বছরের অক্টোবর মাসের ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে। বিবিএসের প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, চাল, ডাল, তেল, লবণ, মাছ, মাংস, সবজি, মসলা ও তামাকজাতীয় পণ্যের দাম বাড়ায় খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ। তবে বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে সাধারণ বা গড় মূল্যস্ফীতির হার হয়েছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ, গত মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। অক্টোবরে বাড়ি ভাড়া, আসবাবপত্র, গৃহস্থালি, চিকিৎসাসেবা, পরিবহন ও শিক্ষা উপকরণের দাম কিছুটা কমেছে। মাসটিতে এ খাতে মূল্যস্ফীতির হার হয়েছে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে গত জুলাই মাসজুড়ে আন্দোলন করছেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে দেশে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়। রাজধানী ঢাকা কার্যত সারাদেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। স্থবিরতা নামে পণ্য সরবরাহ। এরই প্রভাবে জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশে উঠেছিল। দেশের ইতিহাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতির এ হার অতীতে আর দেখা যায়নি। এর আগে ২০২৩ সালের আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ হয়েছিল, যা গত ১২ বছরের মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ। এর আগে খাদ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা যায় ২০১১ সালের অক্টোবরে ১২ দশমিক ৮২ শতাংশ। ফলে অক্টোবর মাসে সাধারণ খাত ও খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

অন্তর্বর্তী সরকার নানামুখী চাপে
- আপলোড সময় : ১৬-১১-২০২৪ ০২:৩৯:১৭ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৬-১১-২০২৪ ০২:৩৯:১৭ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ